সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৪ ১৪২৬   ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

amar24.com|আমার২৪
সর্বশেষ:
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ২শ’ গজের মধ্যে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ‘এরশাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে’ ওয়ান ইলেভেনে আশরাফের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল : প্রধানমন্ত্রী
৩৮৫

রাজধানীর যানজটের কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশিত: ৫ মার্চ ২০১৯  

মীর আব্দুল আলীম: ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে রাজধানীর যানজট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি বলতে গেলে তো বের হওয়াই ছেড়ে দিয়েছি। আমি বের হলেই ট্রাফিক আটকায়। অফিস এবং কোথাও যদি কর্মসূচি থাকে সেখানে ছাড়া আর কোথাও যাওয়াই হয় না এ জন্যই যে, ট্রাফিক যদি আটকে দেয়।’ (যুগান্তর থেকে নেওয়া)

রাস্তায় চলতে গিয়ে ট্রাফিকে আটকে যাওয়ার ভীতিটা সবার মধ্যেই রয়েছে। বলতে গেলে রাজধানী ঢাকায় যানজট সমস্যা প্রতিদিন তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপণিবিতান ইত্যাদি জায়গায় যাতায়াত করা দুঃস্বপ্নের মতো।

তাতে করে আমাদের শ্রমঘণ্টা অপচয়জনিত জাতীয় উৎপাদনশীলতার ক্ষতি, জ্বালানি সাশ্রয় বা অসহনীয় দুর্ভোগ কমাতে কোনোই কাজে লাগছে না। তাহলে এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?

রাজধানীর যানজট কমাতে যেসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, কোনোটাই কাজে লাগছে না; বরং আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে যানজট কমানোর ছোট উদ্যোগে জট অল্প বাড়ে, মস্ত উদ্যোগে দ্বিগুণ বাড়ে যানজট।

যানজট সমস্যা মোকাবেলায় এর আগেও অনেক উদ্যোগের বাস্তবায়ন করেছে কর্তৃপক্ষ। দিনের বেলা শহরে ট্রাক ও আন্তঃনগর বাসের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন রাজধানী শহরের মধ্যে হওয়ায় রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে অনেক ব্যস্ত রাস্তা একটা উল্লেখযোগ্য সময় ধরে বন্ধ থাকে; ফলে ট্রেন চলাচলের সময় বদলানো হয়েছে, দূরগামী যাত্রীর সুবিধা-অসুবিধার কথা খেয়াল না রেখে।

বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলা বন্ধ করা হয়েছে। পথচারী পারাপারের জন্য রাস্তায় যে জেব্রা ক্রসিং ছিল, সেগুলো বাতিল করে ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি চালু করা হয়েছে, সর্বশেষ সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে। তাহলে কেন যানজট কমছে না?

যানজটের কারণে রাজধানীতে পরিবহন প্রবেশ করতে না পারায় প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয় নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা এই ১২ ঘণ্টায় রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনকে যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়।

এরই মধ্যে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে প্রায় ২০০ বিভিন্ন ধরনের নতুন পরিবহন। ২০৩০ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা হবে ৩ কোটি। এ প্রেক্ষাপটে যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই। রাজধানী ঢাকাকে সবার জন্য বসবাসের উপযোগী করতে হলে সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন জরুরি।

আমাদের যতটুকু সড়কপথ আছে, তাতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানাবিধ পদক্ষেপ নিলে যানজট ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের বড় বড় শহর, এমনকি হজের সময় মক্কা, মদিনা, অলিম্পিক গেমসহ নানা বড় আসরের সময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সে সময় কত সহজেই না যানজট নিয়ন্ত্রণ করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

চীনে যখন অলিম্পিকের মতো বড় আসর হল, তখন তারা একদিন পরপর জোড়-বেজোড় নম্বরের প্রাইভেট গাড়িগুলো চলাচল করার অনুমতি দিয়ে নতুন কৌশল বের করেছিল। একদিন জোড় সংখ্যার গাড়িগুলো রাস্তায় চলার অনুমতি দিয়েছে তো পরদিন দিয়েছে বেজোড় সংখ্যার গাড়িগুলো।

বিশেষ মুহূর্তগুলোতে বাইরের শহরের গাড়িগুলো শহরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়নি। সে ক্ষেত্রে আগে থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে পত্রিকায় ঘোষণা দেয়া হয়, ফলে দুর্ভোগ হয় না; হয় না যানজটও। জোড়-বেজোড় নম্বরের গাড়িগুলো আমাদের রাজধানীতেও একদিন পরপর চলাচল করতে দেয়া যেতে পারে।

ঢাকা মহানগরীর যানজট, পার্কিং সমস্যা, পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগের পরিপ্রেক্ষিতে আশু করণীয় হল- পার্কিং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, বিনা মূল্যে পার্কিং বন্ধ করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা, সর্বত্র জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং ফি নেয়া, পার্কিং থেকে প্রাপ্ত অর্থ পাবলিক পরিবহনের মানোন্নয়নে ব্যয় করা।

ফিলিপাইনে একসময় তীব্র যানজট ছিল। সেখানে স্বাভাবিক চলাচল ছিল কষ্টসাধ্য। যতদূর জানি, সেখানকার ট্রাফিক ব্যবস্থা এখন বেশ নিয়ন্ত্রিত। কীভাবে? ভালো একটি আইন তৈরি হয়েছে ফিলিপাইনে। ফিলিপাইনের আইন অনুসারে সেখানে কোনো গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের অক্ষরটা যদি ১ অথবা ২ দিয়ে শেষ হয়, তবে সেই গাড়িটি রাস্তায় সোমবারে থাকার অনুমতি পাবে না। আবার যদি সেটা ৩ বা ৪ দিয়ে শেষ হয়, তাহলে মঙ্গলবার গাড়িটাকে থাকতে হবে ঘরেই।

৫ ও ৬ যাদের গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের শেষ অক্ষর, তারা তাদের গাড়ি নিয়ে বেরোবেন না বুধবার। বৃহস্পতিবারে রাস্তায় থাকবে না সেসব গাড়ি- যেগুলোর লাইসেন্স প্লেটের শেষে রয়েছে ৭ ও ৮। আর ৯ ও ০ যাদের গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের শেষ নম্বর, তারা বাড়িতেই থাকেন শুক্রবারে। তো কী মনে হয়? ফিলিপাইনের এ আইনটা যে নতুন পরিকল্পনাটা দিল, তা কি কাজ দেবে বাংলাদেশে?

রাজধানীর যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে, অতিরিক্ত প্রাইভেট কারের উপস্থিতি। রাস্তার যানবাহনের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাইভেট কার। কোনো কোনো পরিবারের ৩-৪টি প্রাইভেট কার রয়েছে। কোনো কোনো সময় দেখা যায়, কার ড্রাইভার ও একজন যাত্রী। রোড লাইসেন্স দেয়ার সময় কর্তৃপক্ষ এসব বিবেচনায় আনে বলে মনে হয় না। একটি রিপোর্টে দেখা যায়, রাজধানীর মোট রাস্তার ৫৪.২ শতাংশ জায়গা দখলে রাখে প্রাইভেট কার।

ট্রাফিক অব্যবস্থাপনাও যানজটের কারণ। ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যালের তোয়াক্কা না করে একই পয়েন্টে আধাঘণ্টা পর্যন্ত একদিকের যানবাহন আটকে রাখে। অনেক সময় অটো সিগন্যাল বাতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সবুজ বাতির বদলে ট্রাফিক পুলিশের হাত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা পুলিশ সার্জেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহার নয় কি?

ট্রাফিক বিভাগের হিসাবমতে, সড়কের কম করে হলেও ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। এ ছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় প্রধান সড়কেই হেঁটে চলেন নগরবাসী। ফলে যানজটের সঙ্গে আছে জনজট। আরেকটি মজার হিসাবও আছে।

ঢাকায় ১৫ শতাংশ যাত্রী দখল করে আছেন মোট সড়কের ৭০ শতাংশ। কীভাবে? স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট এসটিপির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কম-বেশি ১৫ শতাংশ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন। এ প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ শতাংশেরও বেশি রাস্তা। বাকি ৮৫ শতাংশ যাত্রী অন্য কোনো ধরনের গণপরিবহন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তারা গণপরিবহনের মাধ্যমে সড়কের মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকা ব্যবহারের সুযোগ পান। এটা দেখবে কে?

যানজটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা সময়ের দাবি। সরকারকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে, যাতে জনগণ এ দুর্ভোগ থেকে রেহাই পায়। এ সমস্যার সমাধানকল্পে কয়েকটি প্রস্তাব দেয়া যেতে পারে, যা বাস্তবায়ন হলে যানজটের

সমস্যা থেকে ঢাকাবাসী মুক্তি পেতে পারেন-

১. যেসব দেশের বিভিন্ন শহরে আগে যানজট ছিল, এখন নিয়ন্ত্রিত যানজট; সেসব দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের আমাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে যানজট নিরসনে পরামর্শ নেয়া।

২. যানজট সমস্যা নিরসনে দেশি-বিদেশি সদস্যের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এ কমিশন যানজটের প্রকৃত কারণ নির্ণয়সহ সমাধানের পরামর্শ দিতে ও প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের পরামর্শ দেবে।

৩. রাজধানীর শহরতলির যানজট নিরসনে যাদের ভূমিকা রয়েছে, তাদের ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে কাজে লাগানো যেতে পারে। ৪. রাজধানী ঢাকায় প্রাইভেট কারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাধিক্য যানজটের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচ্য হয়।

৫. অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে ফুটপাত ও অন্যান্য রাস্তা দখলমুক্ত করতে হবে।

. লেভেল ক্রসিংগুলোয় ওভারব্রিজ তৈরি করলে যানজট অনেকাংশে নিরসন হবে।

৭. গাড়ির চালককে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে।যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করা ও গাড়ি ঘোরানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা দরকার।

৮. রাজধানীতে সৎ, পরিশ্রমী এবং সাহসী ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।

৯. যানজট নিরসনে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। আমরা মনে করি, এসব বিষয়ে আংশিক কাজ হলেও যানজট অনেকটা কমে আসবে।

পরিশেষে বলব, অবৈধ গাড়ি পার্কিং ও ফুটপাত দখল করে রাস্তা সংকীর্ণ করা থেকে জনগণকে বিরত রাখতে হবে। নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনগণের স্বার্থে যানজট নিরসনে অচিরেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে- এটাই প্রত্যাশা।

মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক, গবেষক

newsstore13@gmail.com

এই বিভাগের আরো খবর