বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৬ ১৪২৬   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

amar24.com|আমার২৪
সর্বশেষ:
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ২শ’ গজের মধ্যে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ‘এরশাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে’ ওয়ান ইলেভেনে আশরাফের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল : প্রধানমন্ত্রী
৪৬৪

যেখানেই চা সেখানেই আশা!

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ নভেম্বর ২০১৮  

এই আসি আসি করে না–আসা শীতের আমেজমাখা হেমন্তের সকালে বারান্দার রোদে পিঠ এলিয়ে দিয়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা পান করতে করতে আপনার যদি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের কথা মনে পড়ে যায়, তাতে অবাক হবেন না। ১০২০ সালে তিব্বত ভ্রমণের সময় তিনি চা পান করেছিলেন বলে শোনা যায়। সে জন্য চা পানকারী প্রথম বাঙালি হিসেবে তাঁকেই ধরা যায়।

শ্রীজ্ঞানের সময় থেকে হিসাব করলে বাঙালি জাতিকে চা পানে অভ্যস্ত করার দোষে দুষ্ট ব্রিটিশরা নিতান্তই শিশু। অবশ্য এই ব্রিটিশদের কারণেই এখন বঙ্গভূমিতে বাঙালি সন্তানেরা প্রভাতি ঘুমের আলস্য ঝেড়ে চনমনে সকালের আশায় চোখ মেলার আগেই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা চাইছে! আহারে-আপ্যায়নে-আমোদ–প্রমোদে-বিরহ-ব্যর্থতায়-তর্কে-বিতর্কে চায়ের কাপে ঝড় তুলছে। আর ঝাঁপ তোলা টংয়ে শয়ে শয়ে হাতি-ঘোড়া-ডাইনোসর মারতে মারতে পকেট উজাড় করছে! ব্রিটিশ বুদ্ধির মাহাত্ম্যটাই এখানে।

বিশ শতকের শুরুতে, ১৯০০ সালে গিরিশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন বাংলা ভাষায় প্রথম চা প্রস্তুত প্রণালী শিক্ষা লিখছেন, তার ১১৮ বছর পর আমরা দেখতে পাচ্ছি সেই ভাষায় কথা বলা বাংলাদেশের মানুষ চায়ের নেশায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এই বঙ্গভূমিতে কত রঙের যে চা খাওয়া চলে, তার খবর রাখা সত্যিই কঠিন। দুধ চা, র চা, লেবু চা, আদা-লেবু চা, মালটা চা, মরিচ চা, তেঁতুল চা, শাহি চা, মসলা চা, মালাই চা, মটকা চা—খুঁজলে আরও হরেক পদের চা পাওয়া যাবে বাংলাদেশের আনাচকানাচে।

একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, চা পানের একটা ঋতুভিত্তিক ব্যাপার আছে। গ্রীষ্মকালের চেয়ে শীতকালে চায়ের বৈচিত্র্য বেশি, কদরও বেশি। শীতে দুধ চা, র চা, লেবু চা, আদা চায়ের সঙ্গে মরিচ চা, তেঁতুল চা, শাহি চা, মসলা চা, মালটা চা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হিম হিম ঠান্ডায় সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফেরার আগে লাল চায়ের সঙ্গে ঝাল কাঁচা মরিচ চিরে দেওয়া ‘মরিচ চা’ পানে শরীর যে চনমনে হয়ে ওঠে, এ ব্যাপারে চাখোরদের কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। আবার গলা খুশ খুশ করে উঠলে লবঙ্গ আর এলাচি মেশানো ধোঁয়া ওঠা চায়ের নিদান না জানা পাবলিক খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বাড়িতে যত যত্নেই চা বানানো হোক না কেন, দোকানের চা পান না করলে বাঙালির ভাত হজম হওয়া মুশকিল। একেক দোকানের আছে একেক ধরনের খ্যাতি আর চা বানানোর গুপ্ত মন্ত্র। সে কারণে সব দোকানের চা খেয়ে সবাই মজা পায় না। একই এলাকার কোন দোকানের চা যে ভালো, সেটা এক জটিল প্রশ্ন। ‘একটু ভালো চা পাওয়া যায় কোন দোকানে?’ বলে কবীর সুমনও তাঁর গানে এই জটিল প্রশ্নটি তুলতে কসুর করেননি। বড় দোকান বা হোটেলের চেয়ে চিপা গলির ঘুপচিতে থাকা টং দোকানের আকর্ষণ এড়ানোর শক্তি ঈশ্বর আমাদের দেননি। সে কারণেই বোধ হয় জীবনের বহু জটিল সিদ্ধান্ত সহজ করে দেয় কোনো এক কমন মামার দোকানের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। এসব দোকানের গরম পানিতে ধোয়া বহু ব্যবহৃত কাপে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা উত্তেজিত মানুষকে শান্ত করে, আশাহত মানুষকে আশা জোগায়।

ব্রিটিশরা জানত, চা পানে বাঙালি একদিন লায়েক হয়ে উঠবে। সে জন্যই তারা নটরাজ আর্থার উইং পিনেরোকে (১৮৫৫-১৯৩৪) দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল এক মধুর বাণী, হোয়ার দেয়ার’স টি দেয়ার’স হোপ—যেখানেই চা, সেখানেই আশা!

অনার্য তাপস: লোকসংস্কৃতিবিষয়ক গবেষক ও লেখক

এই বিভাগের আরো খবর