শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

amar24.com|আমার২৪
সর্বশেষ:
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ২শ’ গজের মধ্যে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ‘এরশাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে’ ওয়ান ইলেভেনে আশরাফের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল : প্রধানমন্ত্রী
৩০৮

চারটি আবিষ্কারেই সফল হয়েছি : ড. বেলাল

প্রকাশিত: ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

সম্প্রতি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষক এবং সমুদ্রবিজ্ঞানী ড. মো. বেলাল হোসেন নোয়াখালী উপকূল অঞ্চল থেকে ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ ও ‘অ্যারেনুরাস স্মিটি’ নামে দুটি জলজ অমেরুদণ্ডি প্রাণির সন্ধান দিয়েছেন। এর আগেও ২০১৬ সালে তিনি ‘ন্যাপটিস বাংলাদেশি’ এবং ‘ভিক্টোরিওপিসা ব্রুনেইনসিস’ নামে দুটি জলজ অমেরুদণ্ডি প্রাণির সন্ধান দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। বর্তমান কর্মব্যস্ততা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। (ইন্টারভিউটি জাগোনিইজ থেকে )

প্রশ্ন: সম্প্রতি নতুন দুটি অমেরুদণ্ডি প্রাণির সন্ধান দিয়েছেন- এসম্পর্কে যদি একটু বিস্তারিত বলতেন-
ড. বেলাল: আমি মূলত কাজ করি অ্যাক্যুয়েটিক (জলীয়) ইকো সিস্টেম নিয়ে। গত বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমি নোয়াখালীর বিভিন্ন পুকুর, খাল এবং নদী থেকে মাইটসের নমুনা সংগ্রহ করি। এতে আমার সঙ্গী ছিলেন আমারই ছাত্র নোবিপ্রবি মৎস্য ও সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের মো. সাইফুল ইসলাম। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী থেকে সংগৃহিত নমুনা প্রথমে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য ও সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের ল্যাবে শনাক্ত করি। পরে ফলাফলের জন্য মধ্য ইউরোপের দেশ মন্টেনিগ্রতে গবেষক ড. ভ্লাদিমিরের কাছে পাঠাই। ড. ভ্লাদিমির নমুনাগুলো চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করেন ও সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

প্রশ্ন: এই জলজ প্রাণিগুলো দেখতে কেমন? 
ড. বেলাল: মাইটস দেখতে কিছুটা মাকড়সার মতো। এরা প্রাণিজগতের আর্থোপোড়া পর্বের একারিয়া বর্গের অন্তর্গত। আমি এবং আমার গবেষকদলের আবিষ্কৃত প্রাণি দু’টি ওই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। তাই এরাও আর্থোপোড়া পর্বের একারিয়া বর্গের অন্তর্গত প্রাণি। এদের আকার ২-৩ মিলিমিটার, দেখতে হাল্কা লাল ও হলুদ বর্ণের হয়। দুটি শুঁড় ছাড়াও এদের চার জোড়া সন্তরণ পা থাকে। এরা সাধারণত পুকুর, নদী বা খালের পানির উপরের স্তরে ভাসমান উদ্ভিদের সাথে ঝুলে থাকে। খাবার হিসেবে উদ্ভিদকণা গ্রহণ করে। তবে লার্ভা অবস্থায় এরা অন্য জলজ প্রাণির দেহে পরজীবী হিসেবে বাস করে এবং ওই প্রাণি থেকেই খাবার সংগ্রহের কাজ করে থাকে। এরা জীবজগতের খাদ্যচক্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রশ্ন: আপনিসহ আর কে কে এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন?
ড. বেলাল: আমার সাথে মন্টেনিগ্রোর একারলজিস্ট ড. ভ্লাদিমির, ভারতের টাপাস, নোবিপ্রবির ছাত্র মো.সাইফুল ইসলাম এবং পোল্যান্ডের ড. আন্দ্রেজেঝ সহ গবেষক হিসেবে ছিলেন।

প্রশ্ন: আপনি এর আগেও নতুন দুটি প্রজাতির সন্ধান দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে আরো দুটি জলজ প্রজাতির সন্ধান দিলেন- এগুলো নিয়ে এর আগে কি কোন গবেষণা হয়েছিল?
ড. বেলাল: না, ২০১৬ সালে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত ন্যাপটিস বাংলাদেশি এবং ব্রুনাইয়ের সমুদ্র এলাকা থেকে ভিক্টোরিওপিসা ব্রুনেইনসিসসহ এ পর্যন্ত আমার আবিষ্কৃত ৪টি প্রাণি নিয়ে আগে কখনো কোন গবেষণা হয়নি। এগুলো নতুন। আর গবেষণা অন্য বিভাগের কাজ। আমার কাজ হচ্ছে আবিষ্কার পর্যন্ত।

প্রশ্ন: আপনার এই সন্ধানকৃত জলজ প্রাণিগুলো মানবকল্যাণে কিভাবে অবদান রাখতে পারে?
ড. বেলাল: সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীতে যতো প্রাণি সৃষ্টি করেছেন সব কিছুই মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়। আমি কাজ করি মূলত অ্যাক্যুয়েটিক (জলীয়) ইকো সিস্টেম নিয়ে। অ্যাক্যুয়েটিক ইকো সিস্টেমে সবচেয়ে নিচের স্তরের প্রাণি হলো ব্যাক্টেরিয়া আর উপরের স্তরের প্রাণি বলা যায় মাছ। এরা একে অপরের ওপর খাদ্যের জন্য নির্ভরশীল। যেমন বড় মাছ নির্ভরশীল ছোট মাছের ওপর, ছোট মাছ নির্ভরশীল অন্য কোনো ছোট মাছ বা জুয়ো প্ল্যাঙ্কটনের (প্রাণিকণা) ওপর, জুয়ো প্ল্যাঙ্কটন নির্ভরশীল ফাইটো প্ল্যাঙ্কটনের ওপর। আবার সমুদ্রের নিচে যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকে, তাহলে ফাইটো প্ল্যাঙ্কটন জন্মাবে না, এটা একটি চেইন। এই চেইনের কোনো একটি উপাদান যদি না থাকে খাদ্যচক্র ভেঙে পড়বে এবং জীববৈচিত্রের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

প্রশ্ন: দেশের গবেষণা খাতে তেমন বাজেট বরাদ্দ থাকে না- বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? 
ড. বেলাল: গবেষণা খাতে খুব কম বরাদ্দ থাকে- এটা সত্য। তবে এর পরিমাণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এ খাতে বর্তমানে অনেক বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনার বর্তমান সন্ধানকৃত দুটি প্রাণির মধ্যে একটির নামকরণ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামানুসারে করেছেন- এটি কিভাবে সম্ভব হলো?
ড. বেলাল: আমার সহযোগীদের আমি বললাম, যেহেতু দুটি প্রাণি; আমি একটির নামকরণ করতে চাই আর আপনারা একটির নামকরণ করেন। তারা রাজি হলেন। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নামের সংক্ষিপ্ত রূপটি সংযুক্ত করলাম। কিন্তু উচ্চারণ ভালো লাগছিল না, সেজন্য বাংলা নাসের সংক্ষিপ্ত রূপটি সংযুক্ত করে দেখলাম ভালো লাগছে। আর এটি নোবিপ্রবির অনুসারে নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া নামে আত্মপ্রকাশ করলো।

প্রশ্ন: কোন সমস্যা গবেষণাকে বাধাগ্রস্ত করে কিনা?
ড. বেলাল: এটা ঠিক যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ যদি শান্ত না থাকে, তাহলে গবেষণার পরিবেশ ঠিক থাকে না। ফলে গবেষণা কার্যক্রম চালানো যে কারো জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগলিক অবস্থানে আপনার কোন অসুবিধা হয় কিনা?
ড. বেলাল: আমার বিষয় হলো মৎস্য ও সমুদ্র বিজ্ঞান। আমি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র নিয়ে কাজ করি। বিশ্ববিদ্যালয় উপকূলে হওয়াতে আমার জন্য যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে। আমি চাইলেই সমুদ্রে যেতে পারি, বিশেষ করে নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ ও সন্দ্বীপে সহজে গবেষণা করতে পারি। তবে অসুবিধা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে গবেষণার প্রতি আগ্রহ কেমন?
ড. বেলাল: এটা আসলে নির্ভর করে পরিবেশের ওপর। বাইরের দেশে যা হয়- যখন একজন শিক্ষার্থী ১ম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়; তখন থেকে তাদেরকে গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়, উৎসাহ দেওয়া হয় এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা এরকম সুযোগ-সুবিধা পায় না, আমি মনে করি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ১ম বর্ষ থেকে গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তোলা উচিত।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে মাছ নিয়ে কেমন গবেষণা হচ্ছে?
ড. বেলাল: বাংলাদেশে কিছু মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র আছে, তারা গবেষণা করছে। পাশাপাশি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মৎস্য বিভাগ রয়েছে, তারাও গবেষণা করছে। তবে জাতীয়ভাবে কোন মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র নেই। গবেষণার ফলেই মূলত মাছের উৎপাদন বাড়ছে। মিঠাপানির অনেক নতুন প্রজাতির মাছ আবিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আশাকরি বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে একদিন শীর্ষস্থান অর্জন করবে।

প্রশ্ন: গবেষণার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে কেমন সমর্থন পান?
ড. বেলাল: পরিবার থেকে যথেষ্ট সমর্থন পাই। আমার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিত। তাই আমাকে গবেষণায় উৎসাহ দেয় সবসময়। তবে আমি ব্যস্ত থাকায় পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারি না।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে কি দেশেই থাকবেন, নাকি বাইরে চলে যাবেন?
ড. বেলাল: আমার স্ত্রী পিএইচডি শেষ করেছে। তারও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা আছে। গবেষণায় পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাই বাংলাদেশেই থাকবো আশাকরি। যদিও অস্ট্রেলিয়া ও ব্রুনাই থাকার সুযোগ আছে।

প্রশ্ন: গবেষণা করতে গিয়ে কি কোন বরাদ্দ পেয়েছেন?
ড. বেলাল: না, এ পর্যন্ত যতটুকু গবেষণা করেছি; সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং নিজস্ব অর্থায়নে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র নিয়ে ব্যাপক আকারে গবেষণা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

এই বিভাগের আরো খবর