সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৪ ১৪২৬   ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

amar24.com|আমার২৪
সর্বশেষ:
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ২শ’ গজের মধ্যে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ‘এরশাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে’ ওয়ান ইলেভেনে আশরাফের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল : প্রধানমন্ত্রী
৩৭৫

আমাদের নগর সভ্যতা এবং পাবলিক টয়লেট

এ বি এম মোবাশ্বের হোসেন

প্রকাশিত: ২০ নভেম্বর ২০১৮  

একটি নগরের সৌন্দর্য্য ও এর প্রতি জনগণের আগ্রহ তৈরি হয় সে নগরীতে গড়ে ওঠা অবকাঠামো এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনাকে ভিত্তি করে। নগরের অবকাঠামোগুলোর নান্দনিকতা মানবসভ্যতার উন্নয়নের চিত্রকে  দৃশ্যমান করে।

একটি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ নামের এ দেশটির জন্ম। প্রায় ৪৭ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব মানচিত্রে একটি উন্নয়শীল দেশ হিসাবে স্বীকৃত। ৪৭ বছরের এ দীর্ঘ পথচলায় রাজনৈতিক নেতৃত্বে ও সাধারণ নাগরিকদের আন্তরিকতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বাংলাদেশের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ সৃষ্টি করছে। হাজারো উন্নয়নের মধ্যে এখনও বাংলাদেশের কিছু উন্নয়নের বিষয়ে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন আর তা হলো–পর্যটক, পথচারী, নিম্নবিত্তের মানুষের জন্য নগরের জনবহুল স্থানগুলো পাবলিক টয়লেট স্থাপন এবং এর সার্বক্ষণিক ব্যবস্থাপনা করা। 

কারণ আমরা প্রতিটি মানুষ যখন নিজের ঘর বা কর্মস্থলের বাইরে থাকি তখন প্রাকৃতিক এ প্রয়োজনের সময় খুবই অসহায় বোধ করি। এ রকম বিব্রতকর পরিস্থিতি শিকার আমরা কমবেশি সবাই হয়েছি; তারমধ্যে নারীদের অবস্থা বর্ণনাতীত। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বর্তমানে বাংলাদেশের কিডনি জটিলতার সমস্যায় ভোগে এমন রোগীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা সর্বাধিক কারণ পাবলিক টয়লেটের অপ্রতুলতা এবং এর নিরাপত্তা সমস্যার কারণে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে নারীরা পাবলিক টয়লেটের ব্যবহার করেন খুবই কম। 

প্রাকৃতিক কাজটি সম্পাদন করার জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয় নিজ বাসায় ফেরা পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় প্রাকৃতিক প্রয়োজনটি চেপে রাখার কারণে স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়। পাবলিক টয়লেটের অপ্রতুলতার এ সমস্যার ভূক্তভোগী বস্তিতে বসবাস করা নিম্নআয়ের মানুষগুলো বিশেষ করে গার্মেন্টসকর্মীরা। কারণ বস্তিতে জনসংখ্যার অনুপাতে টয়লেটের সংখ্যা খুবই কম এবং সকালবেলা কাজে যাওয়ার আগে নারীদের টয়লেট ব্যবহার করার জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয় অথবা নিজ কর্মস্থলে পৌঁছানো পর্যন্ত এই প্রাকৃতিক প্রয়োজনটি চেপে রাখতে হয়।

আমাদের রাজধানী ঢাকা একটি জনবহুল জনপদ, প্রতিদিন এ নগরীতে লক্ষাধিক মানুষ পেশার প্রয়োজনে আসা-যাওয়া করে থাকেন। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ঢাকা শহরে কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লক্ষাধিক মানুষ চলাচল করে এবং এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী কিন্তু এর অপ্রতুলতায় পুরুষরা রাস্তার পাশে উন্মুক্ত স্থানে এই প্রাকৃতিক কাজটি সম্পাদন করে থাকেন। যা সভ্য সমাজব্যবস্থার একটি খারাপ উদাহরণ। যারা এই কাজটি করেন, তাদের আমরা কোনোভাবেই দোষ দিতে পারি না। কারণ পাবলিক টয়লেটের অবকাঠামোর অপ্রতুলতা এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা তাদের এমন কাজটি করতে বাধ্য করছে। তবে বর্তমানে ঢাকা শহরের অধিকাংশ ফুটপাত এবং রাস্তার পাশের উন্মুক্ত স্থানগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসার স্থান হিসাবে ব্যবহার করার কারণে পুরুষরাও এখন যেখানে সেখানে এই প্রাকৃতিক কাজটি সম্পাদন করতে পারেন না।

তবে আশার বিষয়, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ পাবলিক টয়লেটের সমস্যা সমাধানকল্পে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩০টি আধুনিকমানের পাবলিক টয়লেট স্থাপন করেছে। এই আধুনিক মানের টয়লেটগুলো ঢাকা শহরে চলাচলকারী মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, যার কারণে গত পাঁচ বছরে আধুনিকভাবে নির্মিত এ সব পাবলিক টয়লেট ৭০ লক্ষাধিক বার ব্যবহার করা হয়েছে।  অধিকাংশ ব্যবহারকারী তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এই সফলতার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সরকার ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনকে জনসংখ্যার অনুপাতে আরও অধিক সংখ্যক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছে। সে সুবাধে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন চাহিদা অনুযায়ী আরও পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করছে। পাবলিক টয়লেট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য যুগোপোযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ঢাকা শহরের বর্তমান পাবলিক টয়লেটগুলোর সফলতায় বাংলাদেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন পাবলিক টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নিসয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট, অন্যতম। এ উদ্যোগকে সমুন্নত রাখার জন্য স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রত্যক্ষ ভূমিকা অনস্বীকার্য।

উল্লেখ্য, পাবলিক টয়লেটের নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে উৎসাহজনকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন– স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ও রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বাংলাদেশ বিল্ডিং রিসার্চ ইনিস্টিটিউট, ইত্যাদি। পাবলিক টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানায়। কারণ এর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের প্রাকৃতিক এই কাজটি সম্মানের সঙ্গে করতে পারবে। একজন মানুষের নিজ আবাসস্থলের টয়লেটটির ব্যবস্থাপনা বলে দেয় সেই মানুষটির রুচি এবং পরিচ্ছন্নতাবোধ কেমন, তেমনি একটি নগরীর পাবলিক টয়লেটের পরিবেশ বলে দেয়, সে নগরে বসবাসকারী নগরবাসী সর্বোপরি সেই নগরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের রুচি ও পরিচ্ছন্নতাবোধের আন্তরিকতা।

পাবলিক টয়লেটের এ সংস্কৃতি বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে একটি সেবাধর্মী রাষ্ট্র হিসাবে। সে সুবাধে বাংলাদেশ সরকার সবসময়ই জনকল্যাণকর উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করে থাকে। পাবলিক টয়লেট তার মধ্যে অন্যতম, কিন্তু পাবলিক টয়লেটের নির্মাণ করার সময় যতটা আগ্রহ এবং মনোযোগ থাকে, ব্যবস্থাপনায় সে আগ্রহ এবং মনোযোগ একেবারেই কমে যায়। পাবলিক টয়লেট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ অবকাঠামোকে তাদের প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আদায়ের উৎস হিসাবে বিবেচনা করার কারণে এর পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনও মনোযোগ দেয় না। ফলে নির্মিত পাবলিক টয়লেটগুলো হয়ে পড়ে ব্যক্তি বিশেষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই পাবলিক টয়লেটকে নগরবাসীর সেবা দেওয়ার অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা। প্রয়োজনে এর পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানকে বাৎসরিক ভর্তুকি বাজেট রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ভর্তুকি বাজেটকে সীমিত রাখার জন্য পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনাকালীন কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে এর আয় থেকে দায় শোধের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। প্রথমত ব্যবহারকারী সংখ্যা বৃদ্ধিকল্পে টয়লেটটি নির্মাণ করতে হবে পথচারীদের জন্য সহজে দৃশ্যমান স্থানে। যেখানে নারী, প্রতিবন্ধী ও সব স্তরের জনগণের প্রবেশ সহজ হবে। 

দ্বিতীয়ত নারী, পুরুষ, শিশু ও প্রতিবন্ধী বান্ধব পৃথক অবকাঠামো রাখা। তৃতীয়ত, সব ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। চতুর্থত অপেক্ষাকৃত কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, তেমন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরঞ্জাম ব্যবহার করা। পঞ্চমত, ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সেবামূল্য গ্রহণের পাশাপাশি অন্য উৎস থেকে আয় করার সুযোগ রাখা। যেমন, টয়লেটের দেয়াল কোনও বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ভাড়া দেওয়া, একটি অংশ এটিএম বুথ হিসাবে ভাড়া দেওয়া, ইত্যাদি। ষষ্ঠত, টয়লেটের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের অবকাঠামো হবে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো এবং এর চত্বর হবে সবুজে ঘেরা।   

নির্মাণ পরবর্তী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। যেমন– প্রথমত পাবলিক টয়লেটটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি তথা সামাজিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহী ব্যক্তিবর্গকে/প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা। দ্বিতীয়ত, দক্ষ নারী ও পুরুষকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা এবং তাদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, টয়লেট ব্যবহারকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপকরণ যেমন–টয়লেট টিস্যু, হাতধোয়ার সাবান, স্যানিটারি ন্যাপকিন, সার্বক্ষণিক পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা। চতুর্থত, প্রতিবন্ধী  ব্যবহারকারীদের টয়লেট ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। পঞ্চমত, টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।

উন্নয়নশীল দেশ ও জাতি হিসাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থাপনায় একটি মাইলফলক হবে এই প্রত্যাশায় ‘ওয়ার্ল্ড টয়লেট ডে’ ২০১৮ উৎযাপন করছে বাংলাদেশ। সর্বোপরি জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ছয় নম্বর লক্ষ্যপূরণে পাবলিক টয়লেট বিশেষ ভূমিকা রাখবে।  

লেখক:  উন্নয়নকর্মী

এই বিভাগের আরো খবর